জেলা প্রতিনিধি
২৬ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:১৩ পিএম
দুপুরের দিকে ফোনে শেষ কথা হয়েছিল মেজ ভাবি আছমা বেগমের সঙ্গে। অপর প্রান্তে ছিল চেনা এক কণ্ঠ, হাসি-ঠাট্টায় ভরা। বলেছিলেন, ভাবি, ইলিশ মাছ কিনে রাখেন, দু-এক দিনের মধ্যে বাড়িতে আসব। আছমা বেগমও হেসে বলেছিলেন, ঠিক আছে, কালাম, আসবেন।
কিন্তু তারপর আর কোনো আসা হলো না— সেই কণ্ঠ, সেই হাসি সব থেমে গেল ফার্মগেটের ব্যস্ততম রাস্তায় এক মুহূর্তেই।
রোববার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের সামনে ঘটে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। মেট্রোরেলের একটি পিলার থেকে ‘বিয়ারিং প্যাড’ নামের ভারী ধাতব যন্ত্রাংশ খুলে নিচে পড়ে যায়। নিচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন তরুণ উদ্যোক্তা আবুল কালাম (৩৫)। মুহূর্তের মধ্যে সেই ধাতব অংশটি তার মাথায় আঘাত হানে— দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক জানান, আর বাঁচানো যায়নি।

আবুল কালাম ছিলেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঈশ্বরকাঠি গ্রামের জলিল চোকদারের ছেলে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় একটি ট্রাভেল এজেন্সি গড়ে তুলেছিলেন তিনি। নিজের চেষ্টায় ধীরে ধীরে ব্যবসা দাঁড় করিয়েছিলেন। নিয়মিত ফার্মগেট এলাকায় যাতায়াত ছিল তার।

বর্তমানে তিনি পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জের জলকাঠি এলাকায় বসবাস করতেন। স্ত্রী, পাঁচ বছরের ছেলে আব্দুল্লাহ আর তিন বছরের মেয়ে সুরাইয়া আক্তার— এই ছিল তার ছোট্ট সংসার।
চাচাতো ভাই আব্দুল গণি চোকদার বলেন, আবুল কালাম ছিল আমাদের পরিবারের গর্ব। নিজের মেধা ও পরিশ্রমে দাঁড়িয়েছিল। এমন মানুষটা সরকারের অবহেলার কারণে মারা গেল! এখন তার ছোট বাচ্চাগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে?

দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সড়ক ও রেল উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। তিনি জানান, নিহতের পরিবারের সব দায়-দায়িত্ব মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ নেবে। প্রাথমিকভাবে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পরবর্তীতে পরিবারের কর্মক্ষম সদস্য থাকলে মেট্রোরেলে চাকরির ব্যবস্থাও করা হবে।
তবে স্বজনদের প্রশ্ন—‘টাকার ক্ষতিপূরণে কি একটা প্রাণ ফেরানো সম্ভব? একজন শিশুর বাবার জায়গা কি অন্য কেউ নিতে পারে?
রাজধানীর উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ঘিরে অনেক প্রশংসা। কিন্তু একের পর এক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি— এই উন্নয়নের গায়ে যেন কালো ছাপ লাগিয়ে দিচ্ছে। মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ প্রকল্পে নিরাপত্তা তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণ কতটা কঠোরভাবে হচ্ছে, সেই প্রশ্ন আজ আবারও সামনে উঠে এসেছে।
এক মুহূর্তেই থেমে যাওয়া সেই জীবন এখন কেবল স্মৃতি হয়ে রইল পরিবার ও স্বজনদের কাছে। আছমা বেগমের কণ্ঠে কাঁপুনি বলেন, ‘ইলিশ কিনে রাখতে বলেছিল, আমি রেখেছিলামও… কিন্তু কে খাবে এখন সেই ইলিশ?’
প্রতিনিধি/এসএস