জেলা প্রতিনিধি
২১ জুন ২০২৬, ০৯:৩৪ এএম
পাহাড় থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির এক অনন্য কারিগর পাখি ‘বাবুই’ এবং এর শৈল্পিক ও সুদর্শন বাসা। বাবুই পাখির নিখুঁত বুননে তৈরি বাসা শুধু চমৎকারই না, বরং মানুষের মনেও চিন্তার খোরাক জোগাত এবং আত্মনির্ভরশীল হতে উৎসাহিত করত। ভোরের আলো ফুটতেই এই পাখির মিষ্টি কিচিরমিচির শব্দে গ্রামবাংলার মানুষের ঘুম ভাঙত। কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে আজ এই চিরচেনা পাখিটি বিলুপ্তির পথে।
মাত্র দুই বছর আগেও খাগড়াছড়ি সদরের স্বনির্ভর রাবার কারখানা, দক্ষিণ গোলাবাড়ি মারমাপাড়া, কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এবং গুগড়াছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর বাবুই পাখি দেখা যেত। অথচ এখন শুধু দক্ষিণ গোলাবাড়ি এলাকার একটি তালগাছে মোটে পাঁচটি বাবুই পাখির বাসা টিকে আছে। খড়, ধানের পাতা, খেজুরপাতা ও কাশবনের লতাপাতা থেকে সুতার মতো আঁশ তুলে অত্যন্ত নিপুণভাবে এরা বাসা বুনে থাকে। শিল্পের এমন চমৎকার কারুকাজ আজ পার্বত্য অঞ্চল থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।
সম্প্রতি খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার গুগড়াছড়ি ও কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, এক সময় যেখানে সকাল-সন্ধ্যায় সোনালী ও সবুজ রঙের বাবুই পাখির কলকাকলিতে চারপাশ মুখরিত থাকত, সেখানে এখন কিছু গাছ দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনো বাবুই পাখি বা তাদের বাসা নেই। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাখিপ্রেমীরা পাখি দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

বর্তমানে খাগড়াছড়ি সদরের মধ্যে কেবল দক্ষিণ গোলাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা ক্যাচিং মারমার বাড়ির আঙিনায় কিছু বাবুই পাখির দেখা মেলে। ক্যাচিং মারমা জানান, দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমার বাড়ির উঠানের তাল ও নারকেল গাছে বাবুই পাখিরা বাসা বাঁধছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার পাখির সংখ্যা অনেক কম। আগে আমাদের পাড়ার অন্য খেজুর গাছগুলোতেও শত শত বাবুই বাসা বুনত, কিন্তু গত বছর থেকে সেখানে আর কোনো পাখি আসে না।
একই পাড়ার বাসিন্দা তুতুল মারমা, ক্রাজাইরি মারমা ও থুইম্রা মারমা জানান, প্রতি বছর জুন মাসের দিকে গ্রামে বাবুই পাখিরা দল বেঁধে বাসা তৈরি করে। তাদের চেঁচামেচি ও কিচিরমিচির শব্দে পুরো গ্রাম মেতে থাকে। সদরে এখন আর কোথাও বাবুই দেখা যায় না। মাঝেমধ্যে পাখি শিকারিরা এখানে আসে, তবে গ্রামবাসীদের বাধার কারণে তারা পাখি শিকার করতে পারে না। গ্রামবাসীরাই মূলত এই পাখিদের সুরক্ষার চেষ্টা করছেন।
বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে— নির্বিচারে নারকেল, সুপারি ও তালগাছ নিধন, কৃষিতে কীটনাশকের অপব্যবহার, শিকারিদের দৌরাত্ম্য, অপরিকল্পিত বাসস্থান নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণেই বাবুই পাখি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।\

‘বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটি’-র নির্বাহী সদস্য সাথোয়াই মারমা বলেন, একটা সময় খাগড়াছড়িতে প্রচুর পরিমাণে বাবুই পাখি ছিল। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ফসলি জমি ও গাছপালা কেটে মানুষ ঘরবাড়ি তৈরি করছে। ফলে পাখিদের খাবার ও বাসা তৈরির প্রাকৃতিক সামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমান প্রজন্ম বাবুই পাখি চেনে না বললেই চলে, তাদের কাছে এটি এখন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ।
তিনি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পছন্দের গাছ না পেয়ে ইদানিং বাবুই পাখিকে আমগাছ বা বটগাছেও বাসা বুনতে দেখা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় তাল, সুপারি ও নারকেল গাছ না কেটে সেগুলোকে প্রাকৃতিকভাবে টিকিয়ে রাখা উচিত। এই বিষয়ে স্থানীয় পরিবেশবাদীদের দ্রুত এগিয়ে আসা দরকার।

প্রকৃতি ও পাখিপ্রেমীদের দাবি, পরিবেশের এই অনন্য কারিগরকে টিকিয়ে রাখা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। বাবুই পাখিকে আবার পাহাড়ের বুকে ফিরিয়ে আনতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে।

সাথোয়াই মারমা বলেন, পাখিদের পছন্দের গাছগুলো না থাকায় ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে আমগাছ, বটগাছে পর্যন্ত বাসা বুনছে এটা কিন্তু খুব সংখ্যা জনক। তাল, সুপারি ও নারকেলগাছগুলো কর্তন না করেই প্রাকৃতিকভাবে রেখে দেওয়া উচিৎ। এখানকার পরিবেশবাদীরা এগিয়ে আসা উচিৎ আমি মনে করি।
আরও পড়ুন
খাগড়াছড়ি বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা এস.এম মোশাররফ হোসাইন বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের বাবুই পাখিসহ বিভিন্ন পাখি গাছে বসবাস করত সেই গাছগুলো আজ সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। খাগড়াছড়ি বন বিভাগ পাখির খাদ্য উপযোগী তাল, খেজুরগাছসহ বিভিন্ন বৃক্ষ রোপণ এবং স্থানীয়দের মধ্যে চারা বিতরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যেও এসব গাছের চারা বিতরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রকৃতিপ্রেমীদের দাবি, পাখি বাবুইকে টিকেয়ে রাখা সকলের নৈতিক দায়িত্ব এবং বাসা বানানোর বাবুই পাখিকে ফিরিয়ে আনতে সকলকে এক সঙ্গে চেষ্টা করতে হবে।
প্রতিনিধি/টিবি