ধর্ম ডেস্ক
১৯ মে ২০২৬, ০১:১৩ পিএম
জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন মুসলিম উম্মাহর জন্য বছরের শ্রেষ্ঠ সময়। এই দিনগুলোতে নেক আমলের সওয়াব অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি বলে হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। তবে অনেক নারী হায়েজ, নেফাস, গর্ভাবস্থা বা দুগ্ধদানের কারণে এই দিনগুলোতে রোজা রাখতে পারেন না। অনেকের মনে আক্ষেপ জাগে- তবে কি আমি এই বিশাল সওয়াব থেকে বঞ্চিত হব?
ইসলামি শরিয়তের সুস্পষ্ট দলিল ও আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই আক্ষেপের কোনো কারণ নেই। রোজা ছাড়াও ইবাদতের বহু দরজা তাদের জন্য উন্মুক্ত।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অন্যকোনো দিনের আমলই উত্তম নয়।’ (সহিহ বুখারি: ৯৬৯)
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনেও এই দিনগুলোর কসম খেয়েছেন- ‘শপথ ভোরবেলার এবং শপথ দশ রাতের।’ (সুরা ফজর: ১-২)
ইবনে কাসির (রহ.) সহ অধিকাংশ মুফাসসির এই ‘দশ রাত’কে জিলহজের প্রথম দশ রাত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ইসলাম নারীর স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থাকে বিবেচনায় রেখে বিধান প্রণয়ন করেছে। হায়েজ বা নেফাস অবস্থায় রোজা রাখা নিষিদ্ধ- এটি আল্লাহর নির্দেশ। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন- ‘আমরা হায়েজগ্রস্ত হলে আমাদের রোজার কাজা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হতো; কিন্তু নামাজের কাজা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হতো না।’ (সূত্র: সহিহ বুখারি: ১৯৫১; সহিহ মুসলিম: ৩৩৫)
সুতরাং এই অবস্থায় রোজা থেকে বিরত থাকা কোনো ত্রুটি নয়, বরং আল্লাহর হুকুম মানারই অংশ।
আরও পড়ুন: জিলহজ মাসের ৯ রোজা
ইসলামের মৌলিক নীতি হলো- সব আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। কোনো নারী যদি আন্তরিকভাবে এই দিনগুলোতে রোজা রাখতে চান, কিন্তু শরয়ি ওজরে রাখতে না পারেন, তবু তিনি সওয়াব পাবেন ইনশাআল্লাহ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘বান্দা অসুস্থ বা সফরে থাকলে, সুস্থ ও মুকিম অবস্থায় সে যে আমল করত, তার সওয়াবই লেখা হয়।’ (সহিহ বুখারি: ২৯৯৬)
ক. বেশি বেশি জিকির, তাকবির ও তাহমিদ: জিলহজের প্রথম দশ দিনে তাকবির, তাহলিল ও তাহমিদ পাঠের বিশেষ নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘যাতে তারা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।’ (সুরা হজ: ২৮)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘এ দিনগুলোতে বেশি বেশি তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবির (আল্লাহু আকবার) ও তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) পাঠ করো।’ (মুসনাদ আহমাদ: ৫৪৪৬)
পড়া যেতে পারে- আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
নারীরা ঘরের কাজের ফাঁকে, চলাফেরায়, যেকোনো সময় এই জিকির করতে পারেন।
খ. আরাফার দিনের দোয়া (৯ই জিলহজ): আরাফার দিন বছরের সর্বোত্তম দিন এবং দোয়া কবুলের সেরা মুহূর্ত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।’ (জামে তিরমিজি: ৩৫৮৫)
হায়েজ অবস্থায়ও নারীরা এদিন দীর্ঘক্ষণ দোয়া ও ইস্তেগফারে মশগুল থাকতে পারেন। নিজের গুনাহ মাফ, পরিবার ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য দোয়া করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
আরও পড়ুন: জিলহজ মাসের কিছু ভিত্তিহীন আমল
গ. কোরআন অধ্যয়ন ও শ্রবণ: হায়েজ অবস্থায় কোরআন স্পর্শ করে তেলাওয়াত করা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও মোবাইল বা ডিজিটাল মাধ্যমে কোরআন শ্রবণ করা, তাফসির পাঠ করা এবং কোরআনের অনুবাদ অধ্যয়নে কোনো বাধা নেই- এ বিষয়ে আলেমদের ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। এটি আল্লাহর কালামের সাথে সম্পর্ক সজীব রাখার একটি কার্যকর মাধ্যম।
ঘ. দান-সদকা: দান-সদকা সবসময়ই আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় আমল, আর ফজিলতপূর্ণ দিনে তা আরও বেশি মূল্যবান। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, আল্লাহ তা জানেন।’ (সুরা বাকারা: ২৭৩)
সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য হলেও দান করা, অসহায়কে সাহায্য করা বা কোরবানির কাজে আর্থিক অংশগ্রহণ করা এই দিনগুলোতে বিশেষ সওয়াবের কাজ।
ঙ. রোজাদারকে ইফতার করানো: পরিবারের যারা রোজা রাখছেন, তাদের সাহরি ও ইফতার প্রস্তুত করাও মহান ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোজাদারের সমান সওয়াব পাবে, অথচ রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না।’ (জামে তিরমিজি: ৮০৭)
চ. নেক কাজে সহযোগিতা: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি কোনো নেক কাজে সহযোগিতা করে, সে আমলকারীর সমপরিমাণ সওয়াব পায়।’ (আবু দাউদ: ৫১২৯)
পরিবারের সদস্যদের রোজা রাখতে উৎসাহিত করা, কোরবানির প্রস্তুতিতে সহায়তা করা, সন্তানদের ইসলামি জ্ঞান দেওয়া- এসবও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে গণ্য।
আরও পড়ুন: জিলহজের প্রথম ১০ দিনের ফজিলতপূর্ণ ১০ আমল
যারা কোরবানি দেওয়ার নিয়ত করেছেন, তাদের জন্য জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি দেওয়া পর্যন্ত চুল, নখ ও চামড়া না কাটা মোস্তাহাব। এই আমলটি নারীরাও পালন করতে পারেন। এটি রোজার সাথে সম্পর্কিত নয়, বরং কোরবানির সওয়াবের অংশীদার হওয়ার একটি মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোরবানি করতে চায়, সে যেন জিলহজের চাঁদ দেখার পর তার চুল ও নখ না কাটে।’ (সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭)
যদি রোজা রাখলে মা বা সন্তানের স্বাস্থ্যগত ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে রোজা না রাখার অনুমতি আছে। পরবর্তীতে কাজা আদায় করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৫)
ইসলাম আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের নাম। আল্লাহর হুকুমেই নারীরা হায়েজ-নেফাস অবস্থায় নামাজ ও রোজা থেকে বিরত থাকেন; এই ‘বিরত থাকা’ও এক ধরনের আনুগত্য। তাই মন খারাপ না করে জিকির, দোয়া, দান-সদকা, কোরআন অধ্যয়ন ও পরিবারকে নেক কাজে সহযোগিতার মাধ্যমে জিলহজের পবিত্র সময়কে কাজে লাগানোই হোক একজন সচেতন মুমিন নারীর লক্ষ্য।
তথ্যসূত্র: আল-কোরআন; সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম; জামে তিরমিজি; মুসনাদ আহমদ; ফাতহুল বারি; তাফসির ইবনে কাসির