২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা ও বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিলেও এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতি ও নীতি বিশ্লেষকরা।
শনিবার (২০ জুন) পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত নীতি সংলাপ ‘আজকের অ্যাজেন্ডা: পিপিআরসি বাজেট বিশ্লেষণ’-এ অংশ নেওয়া বক্তারা এসব বলেন।
তারা বলেন, বাজেটের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। বাজেটে ইতিবাচক অনেক দিক থাকলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফল অর্জন কঠিন হবে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক এবং মালালা ফান্ডের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ মুশাররফ তানসেন।
রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, শক্তিশালী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ছাড়া উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। তিনি বলেন, উৎপাদনশীল খাত ও বেসরকারি উদ্যোগকে সহায়তা দেওয়া গেলে রাজস্ব আয়ও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, বাজেটের অনেক প্রক্ষেপণ দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তবে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
কৃষি খাত নিয়ে অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বাস্তব চাহিদা পূরণে বাজেটের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন ও স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, লিঙ্গভিত্তিক বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও সেটি নারীদের জন্য প্রকৃত সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। তিনি দক্ষতা উন্নয়ন, পরিচর্যা সেবা এবং নতুন অর্থনৈতিক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
স্বাস্থ্য খাত নিয়ে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি জনস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতে আরও দৃশ্যমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
শিক্ষা খাত প্রসঙ্গে মুশাররফ তানসেন বলেন, বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও শেখার ফলাফল উন্নয়নে তার প্রভাব নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্ব না দিলে বাড়তি বরাদ্দ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কোনো বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন তার প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং বাস্তবায়নে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিতা এবং তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ ছাড়া বাজেটের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বাজেট বাস্তবায়ন কার্যক্রমকে ত্রৈমাসিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক অঞ্চলের বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবার মান এবং শিক্ষার গুণগত সংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সব উচ্চাকাঙ্ক্ষা তিনটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়—দুর্নীতি, বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যর্থতা এবং অপ্রয়োজনীয় দফতর ও প্রকল্পের বিস্তারজনিত অপচয়।’
এমএইচ/ক.ম




