সকাল ১০টা। শরীয়তপুর সদর উপজেলার চিকন্দী গ্রামের আদালত চত্বরে তখন দিনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। কেউ মামলার নথি হাতে আইনজীবীর চেম্বারের দিকে ছুটছেন, কেউ আদালত কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে শুনানির অপেক্ষা করছেন। কালো কোট পরা আইনজীবীদের পদচারণা, বিচারপ্রার্থীদের আনাগোনা আর মামলার কাগজপত্র নিয়ে কর্মচারীদের ব্যস্ততা দেখে যে কেউ ভাবতে পারেন- এটি কোনো জেলা শহরের আদালতপাড়া।
কিন্তু না, এটি কোনো শহর নয়। এটি শরীয়তপুরের একটি গ্রাম। আর এই গ্রামের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলমান এক বিচারিক ঐতিহ্য।
চিকন্দী সিনিয়র সিভিল জজ আদালত দেশের অন্যতম প্রাচীন চৌকি আদালত হিসেবে পরিচিত। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত আদালতটি প্রায় ১৫৪ বছর ধরে বিচারসেবা দিয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজব্যবস্থা। কিন্তু চিকন্দীর আদালত আজও একই স্থানে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পদ্মা নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলের মানুষের জন্য আদালতে যাওয়া ছিল কষ্টসাধ্য। সে সময় ব্রিটিশ প্রশাসন নদীপথে বিচারসেবা পৌঁছে দিতে ভ্রাম্যমাণ চৌকি আদালতের ব্যবস্থা চালু করে। পরে স্থায়ী বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আদালতটি চিকন্দীতে স্থানান্তর করা হয়।
১৮৭২ সালে গোলপাতার ছাউনি দেওয়া একটি সাধারণ ঘরে শুরু হয় স্থায়ী বিচারিক কার্যক্রম। সেই ছোট্ট সূচনা আজ বিস্তৃত হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ আদালত কমপ্লেক্সে। বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা আদালত প্রাঙ্গণে রয়েছে আদালত ভবন, বিচারকদের আবাসন, আইনজীবী সমিতি ভবন, আইনজীবীদের চেম্বার, মসজিদ ও পুকুর। শতবর্ষী বৃক্ষের ছায়াঘেরা পরিবেশ আদালতটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

১৯২৬ সালে নির্মিত আদালত ভবনটি এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ভবনের আটটি কক্ষে নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি যেন অতীত ও বর্তমানের এক অনন্য সেতুবন্ধন।
শুধু ঐতিহ্য নয়, বিচারিক কার্যক্রমের দিক থেকেও আদালতটি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এখানে দেওয়ানি মামলার পাশাপাশি পারিবারিক আদালত, অর্থঋণ আদালত, লিগ্যাল এইড কার্যক্রম এবং নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্য পরিচালিত হচ্ছে।
দুজন বিচারক নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের সহযোগিতায় কাজ করছেন ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। আদালত প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ মামলার নিষ্পত্তি করা হয়।
শরীয়তপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফাহিমা আক্তার বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকে পরিচালিত এই চৌকি আদালত এখনো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জেলা শহরের বাইরে গ্রামে অবস্থিত হলেও এটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনেই পরিচালিত হচ্ছে।
আদালতের সেবাগ্রহীতারাও সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। জাজিরা উপজেলার আক্কেল মাহমুদ মুন্সিকান্দি এলাকার বাসিন্দা লোকমান হোসেন মুন্সি জমিজমাসংক্রান্ত একটি মামলার পক্ষভুক্ত। প্রায় এক বছর ধরে তার মামলার বিচারকার্য চলছে। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, মামলাটি এখন বিচারিক পর্যায়ে রয়েছে। নিয়মিত শুনানি হচ্ছে। প্রতিটি তারিখেই বিচারক উপস্থিত ছিলেন। আদালতটি জেলা শহরে না হলেও যাতায়াতে কোনো সমস্যা হয় না।

স্থানীয়দের মতে, আদালতটি শুধু বিচারসেবা দেয়নি; বদলে দিয়েছে পুরো জনপদের চিত্র। আদালতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম। মানুষের যাতায়াত বৃদ্ধি পেয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বিস্তৃত হয়েছে।
নবীন আইনজীবী হাফিজুর রহমানের কাছে আদালতটি পেশাগত জায়গার চেয়েও বেশি কিছু। আবেগ মিশে আছে তার স্মৃতির সঙ্গে। তিনি বলেন, এই আদালতের পরিবেশেই আমার বেড়ে ওঠা। আদালতের পাশের বিদ্যালয়ে পড়েছি, এই মাঠে খেলেছি। পরে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে এখানেই পেশাজীবন শুরু করেছি। আদালতটি না থাকলে হয়তো চিকন্দী আজকের অবস্থানে আসত না।
প্রবীণ আইনজীবীরাও আদালতটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরছেন। তাদের মতে, দেশের অনেক পুরোনো স্থাপনা হারিয়ে গেলেও চিকন্দীর আদালত এখনো তার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখেছে।
চিকন্দী আইনজীবী সমিতির সভাপতি রুবায়েত আনোয়ার ঢাকা মেইলকে বলেন, গ্রামে অবস্থিত হলেও আদালতটিতে বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন। মামলার নিষ্পত্তির হারও ভালো। দীর্ঘদিনের এই আদালত এখন শুধু বিচারিক প্রতিষ্ঠান নয়, শরীয়তপুরের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।

একসময় শরীয়তপুর ছিল ফরিদপুর জেলার একটি মহকুমা। ১৯৮৪ সালে জেলা হওয়ার পর জেলার প্রধান বিচারিক কার্যক্রম শহরে স্থানান্তরিত হলেও চিকন্দীর আদালত তার ঐতিহাসিক অবস্থান ধরে রেখেছে। ফলে গ্রামেই টিকে আছে দেড় শতকের বিচারিক ঐতিহ্য।
আরও পড়ুন
আইনজীবী সনদ পেতে এত বেগ কেন?
দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সম্পত্তি বিরোধের নিষ্পত্তি, পারিবারিক দ্বন্দ্বের সমাধান এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সাক্ষী এই আদালত। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিচারসেবার এমন অনন্য সমন্বয় দেশের অন্য কোথাও খুব কমই দেখা যায়।
চিকন্দীর আদালত তাই কেবল একটি বিচারিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জনপদের বিকাশের গল্প, একটি অঞ্চলের ইতিহাস এবং মানুষের আস্থার প্রতীক। শহরের কোলাহল থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এই আদালত আজও মনে করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচারের আলো ছড়াতে সবসময় শহরের প্রয়োজন হয় না, একটি গ্রামও হয়ে উঠতে পারে বিচারিক ঐতিহ্যের উজ্জ্বল ঠিকানা।
প্রতিনিধি/জেবি




