ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের শপথের পর থেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে—নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কবে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হলেই ঈদের আগে নির্বাচন করার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আর পদ এখনই শূন্য না হলেও পরবর্তীতে শূন্য হলে এই ভোট আয়োজন করবে সাংবিধানিক এ সংস্থাটি।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি নিজেই আর এ পদে থাকতে চান না। এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন মহলে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ও নতুন রাষ্ট্রপতির নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তাই কমিশন প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে, যাতে পদ শূন্য হলে ভোট করতে কোনো বেগ পেতে না হয়।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, একটি নির্বাচন তো আর হুট করে করা যায় না। এজন্য প্রস্তুতির দরকার হয়। আবার রাষ্ট্রপতির পদ কখনো শূন্য রাখা যায় না। তাই কোনো কারণে পদটি শূন্য হলে আমাদের নির্বাচন করে ফেলতে হবে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হলে আমাদের সংসদেরও একটি উপনির্বাচন করতে হতে পারে। কেননা রাষ্ট্রপতি যদি সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হন, তবে সংসদের একটি আসন খালি হবে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আসনেও উপনির্বাচন করতে হবে। তাই সে বিষয়টিও আমাদের দেখতে হচ্ছে। কাজেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পাশাপাশি উপনির্বাচন করতে হয় কি না, সে বিষয়টিও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে আমাদের প্রস্তুতি রাখতে হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিলে পরদিন রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেন। এরপর আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের আলোচনা শুরু হলেও সাংবিধানিক কারণে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সে পথে যায়নি। ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর আলোচনা আবার জোরালো হয়। এদিকে ভোটের আগে এক গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁর আর ভালো লাগছে না এবং ভোটের পর হয়তো পদত্যাগ করবেন। তিনি জানান, নতুন নির্বাচিত সরকার অনুরোধ করলে তিনি সরে যেতে প্রস্তুত।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রপতি এখন সংসদ অধিবেশন ডাকবেন। এরপর যদি বর্তমান রাষ্ট্রপতি থাকতে না চান বা তাঁকে অপসারণ করা হয়, তবেই এই পদে নির্বাচন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংবিধানে তিনটি বিধান রয়েছে। সে অনুযায়ীই কেবল পদটি শূন্য হতে পারে।
রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ ও অভিশংসন প্রক্রিয়া
সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের দিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদে পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। মেয়াদ শেষ হলেও উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকবেন। এক ব্যক্তি একাধিকবার বা ভিন্নভাবে—দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না। স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র দিয়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য নন। আর কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হবে।
রাষ্ট্রপতির অভিশংসন বিষয়ে সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যেতে পারে। এ জন্য সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বাক্ষরসহ অভিযোগের নোটিশ স্পিকারের কাছে দিতে হবে। নোটিশ দেওয়ার ১৪ দিনের আগে বা ৩০ দিনের পরে প্রস্তাবটি আলোচনায় আনা যাবে না। সংসদ অধিবেশনরত না থাকলে স্পিকার সংসদ আহ্বান করবেন।
অভিযোগ তদন্তে সংসদ মনোনীত কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের কাছে রাষ্ট্রপতির আচরণ পাঠানো যেতে পারে। অভিযোগ বিবেচনার সময় রাষ্ট্রপতির উপস্থিত থাকা ও প্রতিনিধি পাঠানোর অধিকার থাকবে। তদন্ত শেষে সংসদের মোট সদস্যের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার তারিখেই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে।
স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে এই বিধানগুলো প্রযোজ্য থাকবে। সে ক্ষেত্রে স্পিকারের স্থলে ডেপুটি স্পিকার সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন করবেন। অভিশংসন প্রস্তাব গৃহীত হলে স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবেন।
অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতির অপসারণের বিধান
সংবিধানের ৫৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতিকে পদ থেকে অপসারণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বাক্ষরসহ অসামর্থ্যের বিবরণ উল্লেখ করে একটি প্রস্তাবের নোটিশ স্পিকারের কাছে দিতে হবে।
সংসদ অধিবেশনরত না থাকলে নোটিশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পিকার সংসদ অধিবেশন আহ্বান করবেন এবং একটি চিকিৎসা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করবেন। প্রয়োজনীয় প্রস্তাব গৃহীত হলে স্পিকার ওই নোটিশের একটি অনুলিপি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে ১০ দিনের মধ্যে চিকিৎসা পরিষদের কাছে পরীক্ষার জন্য উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ জানাবেন। প্রস্তাবের নোটিশ দেওয়ার ১৪ দিনের আগে বা ৩০ দিনের পরে অপসারণ প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে এই সময়ের মধ্যে প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য স্পিকার পুনরায় সংসদ আহ্বান করবেন। প্রস্তাব বিবেচনার সময় রাষ্ট্রপতির উপস্থিত থাকার এবং প্রতিনিধি পাঠানোর অধিকার থাকবে।
রাষ্ট্রপতি যদি চিকিৎসা পরিষদের কাছে পরীক্ষার জন্য উপস্থিত না হন, তবে প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া যাবে এবং সংসদের মোট সদস্যের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে গৃহীত হলে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার তারিখেই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে। আর রাষ্ট্রপতি যদি পরীক্ষার জন্য উপস্থিত হন, তবে চিকিৎসা পরিষদের মতামত সংসদে উপস্থাপনের সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া যাবে না। পরিষদের প্রতিবেদন বিবেচনার পর সংসদের মোট সদস্যের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব গৃহীত হলে সেই তারিখে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে।
এ ছাড়া সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত বা রাষ্ট্রপতি পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে স্পিকার
সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত অথবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, সংবিধানে উল্লিখিত কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে দ্রুত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও যোগ্যতা
সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। একই অনুচ্ছেদের (৪) দফা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না যদি তিনি ৩৫ বছরের কম বয়সী হন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য না হন বা আগে সংবিধানের অধীনে অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকেন।
রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ
সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদে পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। তবে মেয়াদ শেষ হলেও উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকবেন। কোনো ব্যক্তি একাধিকবার বা ভিন্নভাবে—দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না। স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র দিয়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য নন এবং কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কর্তা হিসেবে নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এ জন্য জাতীয় সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে নির্বাচনি কর্তা সভাপতিত্ব করবেন।
সংসদের অধিবেশন চলাকালে নির্বাচন প্রয়োজন হলে ভোটগ্রহণের অন্তত সাত দিন আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে ভোটের সময়সূচি নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন। সংসদের অধিবেশন না থাকলে ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্তত সাত দিন আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সংসদের বৈঠক আহ্বান করা হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাবক ও একজন সংসদ সদস্যের সমর্থকের স্বাক্ষর থাকতে হবে। পাশাপাশি মনোনীত প্রার্থীর সম্মতিসূচক একটি বিবৃতিও জমা দিতে হবে। এই নির্বাচনে সংসদ সদস্যরাই ভোটার হবেন এবং কমিশন ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে। মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে নির্ধারিত দিনে সংসদের বৈঠকে দুপুর ১২টার পর ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোটগ্রহণ ও ভোট গণনা উভয়ই প্রকাশ্যে হবে। সর্বোচ্চ ভোট একাধিক প্রার্থী পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করবেন নির্বাচন কমিশনার। ফল ঘোষণার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
এমএইচএইচ/এআর




